ছোট্ট ভাইয়া

  লেখক: Mutasim Billah


কিভাবে শুরু করবো বুঝতেছিনা, ও হ্যা,
পেয়েছি।
মুয়াজ....,
এটি একটি ছোট্র নাম।
না....... এটা শুধু নাম নয়। এটা একটি ইতিহাস।
আমার চাচা
মাওলানা আফজাল হোসাইন। এক এক করে
চারটি সন্তান
তার। কিন্তু এখনো কোনো ছেলে সন্তানের
মুখ থেকে আব্বু ডাক শোনার ইচ্ছাটি পুরন
হয়নি।
কারণ তার চারটি সন্তানই মেয়। তাই তিনি
আল্লাহর কাছে
দোয়া করলেন
"হে আমার লালনপালন কারী! আমাকে এক পুত্র
সন্তান দান করুন" (সুরা সাফ্ফাতঃ ১০০)। মহান
আল্লাহ
দোয়া কবুল করে নিলেন। চাদের মতো সুন্দর
ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান দ্বারা আলোকিত
করে
দিলো তার বান্দার ঘর। একই সাথে ভরে
গেলো
আমার চাচা চাচির কোল ও বুক। যতো দিন যায়
ততই বড়
হচ্ছে ছেলেটি। মাত্র আট মাস বয়সেই হাটতে
শিখেছে। সাধারণ ছেলেরা যা বড় হয় তার
দ্বিগুন বড়
হয়েছে। ও হ্যা, ওর নামটাইতো বলা হয়নি। ওর
নাম
মুয়াজ। সবার আদরের মুয়াজ। যে দেখে সেই
কোলে তুলে চুমা খায় ওকে। আদরে আদরে
কখন যে কেটে গেলো বেশ ক'টি বছর। যা
টের পায়নি ও নিজেও। এর মধ্যেই ঘোষনা হলো
ফেমিলি মেমবার রা সবাই মিলে বেরাতে
যাবে
গ্রামের বারি অর্থাৎ দাদু বাড়ি। গ্রামের
বাড়ি যাওয়ার কথা
শুনেই বাসায় আনন্দের ঢল নেমে এলো। মুয়াজ
ছিল অনেকটা লাকি ম্যানের মতো। সে কথা
পরে
বলছি। ওর চারটা আপু। সবাই ওকে প্রচন্ড
ভালোবাসে। বিশেষ করে বড় আপুটা, যে
কিনা
জীবনে একটা ধমক পর্যন্ত দেয়নি। যাই হোক
দীর্ঘ সময় ও পথ পারি দিয়ে পৌছে গেলো
দাদু
বাড়ি।
ওহ----হো, মুয়াজের কথা বলতে বলতেতো আমি
নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি মুয়াজের
ভিতরে।
আমি মুতাছিম বিল্লাহ, কেউ কেউ মারুফ বলে
ডাকে।
আমি মুয়াজের চাচাতো ভাই। আমার ফেমিলি
গ্রামেই
থাকে। চাচার পরিবার সহ এসেছে গ্রামে, এ
যে কি
আনন্দের যা বলে শেষ করা জাবেনা। এই
আনন্দের মাত্রাটা বারিয়ে দিতে যে সব
থেকে
বেসি অবদান রেখেছে, সে আর কেহো নয়,
সে সবার প্রিয় আমার ছোট্র ভাইয়া মুয়াজ।
কখনো
এর কোলে ইঠছে, কখনো ওর ঘারে চরছে,
কখনো মুরগীর বাচ্চা তারাচ্ছে, কখনো হাসের
বাচ্চা ধরছে। একবারতো একটা হাসের বাচ্চা
ধরে
আদর করতে করতে মেরেই ফেলেছিল। ওকে
জিজ্ঞেস করলাম কি করছো ভাইয়া?
ও হাসি মুখে বল্লোঃ দেখো ভাইয়া, আমি
হাসের
বাচ্চাটিকে আদর করতে করতে ঘুম পরিয়ে
ফেলেছি। ওর কথা শুনে উপস্হিত সবাই সে কি
হাসি।।।
একবার মুয়াজকে নিয়ে দোকানে
গিয়েছিলাম।
দোকানে জেতেই ও আমাকে বল্লোঃ ভাইয়া
এক
কেজি চকলেট দাও।
আমিঃ চকলেটতো কেজি হিসেবে বিক্রি
হয়না,
চকলেট সংখ্যা হিসেবে বিক্রি হয়।
মুয়াজঃ তাহলে ২০ টি আপেল দাও।
আমি বল্লামঃ ভাইয়া তুমিতো এতগুলি আপেল
খেতে
পারবেনা। তাছারা আপেলতো সংখ্যা
হিসেবে বিক্রি
হয়না। আপেল কেজি হিসেবে বিক্রি হয়।
মুয়াজ বল্লোঃ (পাশে চিপ্স দেখে) ভাইয়া,
তাহলে
তিন কেজি চিপ্স খাবো।সত্যি বলতে কি- - - -
- আমি
মুয়াজকে ভালোবেসে
ফেলেছিলাম। আর ভালোবাসার মানুষের
চাওয়া কি
অপূর্ণ রাখা যায়!!! তাই আমি ওর চাহিদা মতো
ওকে মজা
কিনে দিলাম।
মুয়াজ এতো অল্প বয়সে কিভাবে যে কতো
মানুষের মন জয় করে ফেলেছে, যা বলার
বাহিরে।
ভালোবাসা, স্নেহ আর মমোতামাখা দিন গুলি
ফুড়িয়ে
যায় দ্রুতই। চাচার পরিবার চলে যাবে তাদের
ঠিকানা
রাজশাহীতে। তাদেরকে আগিয়ে দেয়ার জন্য
এখন আমি বাস স্টেশনে। আমার সাথে আছে
ভাইয়া,
রিয়াজ মামা ও আরো অনেকে। সবার বুক যেন
ভার
হয়ে উঠছে। চাচার পরিবার সবাই বাসে। বাস
ছেরে
দিয়েছে, বুকের বাম পাশটাও ক্রমেই ব্যাথা
হচ্ছে।
আপন জন দুরে চলে যাওয়ার কি যে জন্ত্রনা,
যা
অন্যকে বুঝানো সম্ভব নয়। বাস চলার গতি
ক্রমেই
বেরে চলছে। হঠাত লক্ষ করলাম আমার চোখের
কোনা দিয়ে লোনা জল গড়িয়ে পরছে।পাশের
দিকে তাকিয়ে দেখলাম রিয়াজ মামা
কাদতে কাদতে
বসে পরেছে। ততক্ষণে নিজেতে সান্তনা
দিয়ে
অন্যকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলাম।
ভারাক্রান্ত মন
নিয়ে সবাই চলে গেলাম যার যার গন্তব্যে।
সময়
গতিশীল, তাই সময় তার নিজ গতিতে পার করে
দিলো
বেশ ক'টি বছর। এখন মুয়াজের বয়স সাড়ে আট
বছর।
এর মধ্যে ঘটে গেছে সুখ, দুঃখের হাজারো
ঘটনা।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মুয়াজ আরো বহুবার
গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। আমিও
গিয়েছিলাম ওদের
বাসায়। সেকথা নাহয় আজ নাই বল্লাম। দিন্টি
ছিলো ২০১৬
সালের জুলাই মাসের সাত তারিখ, বিশেষ
করে ঈদুল
ফিতরের দিন। আমরা আছি গ্রামের বাড়ি, আর
মুয়াজরা
আছে রাজশাহী সহরে। সবাই মিলে একত্রে ঈদ
পালন না করতে পারলেও আনন্দ কারোরই কম
নয়।
কারণ মোবাইলে যোগাযোগ হয়েছে প্রায়
সবার
সাথেই। যে যার মতো করে ঈদের আনন্দ
উপভোগ করছে সবাই। বেলা গড়িয়ে দুপুর, দুপুর
গড়িয়ে বিকাল। মাগরিবের ঠিক আগ মুহুর্তে
আমাদের
বাসার মোবাইলে চাচার নম্বর থেকে কল
আসলো।
আব্বু হাসিমুখে কলটা রিসিব করে সালাম
দিতেই মুখটা
ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। কল শেষে আব্বুর
কাছে জান্তে পারলাম মুয়াজ রাস্তা পার
হওয়ার সময়ে
এক্সিডেন্ট করেছে, একটি অটো গাড়ি এসে
মুয়াজকে ধাক্কা দেয়, ফলে মুয়াজ মাটিতে
পরে
অজ্ঞান হয়ে জায়। এখন মুয়াজ হসপিটালে
আছে। এ
কথা শুনতেই সবাই গম্ভীর হয়ে গেলো। সাবাই
মুয়াজের সুস্হতার জন্যে দোয়া করতে লাগলো।
আমি দু'রাকাত নামাজ পরে মুয়াজের জন্য
দোয়া
করলাম। এখন রাত এগারোটা, সবাই ঘুমের জন্য
প্রস্তুতি
নিচ্ছে। আমিও প্রতিরাতের মতো আজো
ঘুমিয়ে
পরলাম, কিন্তু ঘুমটা বেশি স্হায়ী হয়নি। তখন
রাত ১টা
বেজে সাত মিনিট। হঠাৎ কারো কান্নার শব্দে
ঘুম
ভেঙ্গে গেলো। জেগে দেখলাম
মেহেদী ভাইয়া কাদছে আর বলছেঃ মুয়াজ
আর
নেই, চলে গেছে না ফেরার দেশে। আমি শুনে
বাক্ রুদ্ধ হয়ে গেলাম, আমি কিংকর্তব্যবিমূর
হয়ে
পরলাম। কথা বলতে চাচ্ছি কিন্তু পারছিনা,
নিঃশ্বাষ বন্ধ
হয়ে আসছে। আমার আব্বুকে কখনো শব্দ করে
কাদতে শুনিনি, সেই আব্বু এ খবর শুনার পর
চিৎকার
দিয়ে কেদে উঠলো। বাড়ির সবাই কদছে, কারণ
সবার আদরের, সবার স্নেহের, সবার
ভালোবাসার
মুয়াজ আর নেই। চলে গেছে খোদার কাছে।
আর কখনো বলবেনা - - - ভাইয়া, একটা চিপ্স
খাবো..........
ভোর হতেই গ্রামের বাড়ি থেকে আমরা ছয়জন
রওনা করলাম রাজশাহীর উদ্দেশ্যে। যেতে
যেতে সন্ধা হয়ে গেলো। দেখলাম সবাই
কাদছে, কারণ মুয়াজ আর এই পৃথিবীতে নেই।
কেউ কাউকে সান্তনা দেয়ার ভাষা খুজে
পাচ্ছেনা,
সবাই কেদেই চলছে। সবার কান্না দেখে আমি
কিছুটা
পাথর হয়ে গিয়েছি। আমি কাদতে পর্যন্ত ভূলে
গেছি। হ্যা, আমি আলোর সাম্নে কাদতে
পারিনা।
আমার মনে পরেনা কারো মৃত্যুর খবর শুনে
কেদেছি। সপথ করলাম, আজো কাদবোনা। তবুও
কেন যেনো দু'চোখে লোনা জলের ঝর্ণা
বইছে। এ রাতে আর ঘুম হলোনা, কোনো রকম
রাতটা পার করে সকালে গেলাম মুয়াজের
গোরস্হানে। সাথে আছে অন্ততো বিশ জন
মানুষ।
সবার চোখ পানিতে ছলছল করছে। এর মধ্যেই
উচ্চ স্বরে দুলাভাই দুজন কেদে উঠলো। আমার
অন্তরও চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলোঃ
মুয়াজ! এই মুয়াজ! ওঠ ভাইয়া ওঠ! তুইনা
কান্নাকাটি পছন্দ
করিসনা। তুইতো সব সময়ে হাসিখুসি থাকতি।
তাহলে
আমাদেরকে কেন কাদাচ্ছিস! ওঠনা ভাইয়া!
ওঠ!
আমাদের কাছে ফিরে আয়। তুইতো সেদিন
বলেছিলি বড় হলে নাকি তুই আর আমি এক
সাথে
থাকবো, একই বাসায় থাকবো। আমি কিন্তু
এখনো
সেই আশা নিয়ে বেচে আছি। আর তুই এতো
স্বার্থপর!! আমাকে ফাকি দিয়ে চলে গেলি
না ফেরার
দেশে!!


Comments